রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন

বাঙালির ন্যায্যতার এক মহাকাব্য বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক (প্রিন্ট সংস্করণ) / ১৪৭ Time View
Update : বুধবার, ৬ মার্চ, ২০২৪
ফাইল ছবি

  • মুক্তির পথ ও ঠিকানা খোঁজার স্মরণীয় একটি দিন

  • ৭ মার্চের ভাষণ এখন বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ

  • ৭ মার্চ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠার দিন

  • অলিখিত ঐতিহাসিক ভাষণের ছায়াসঙ্গী বেগম ফজিলাতুনেছা মুজিব

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণেই রোপিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির ন্যায্যতার এক মহাকাব্য। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণটি দিয়েছিলেন। ভাষণটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের শপথ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির শপথ। প্রায় ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে পাকিস্তানি কামান-বন্দুক-মেশিনগানের হুমকির মুখে শেখ মুজিব ওই দিন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন; ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। একটি বক্তব্য কতটা আবেগময় হতে পারে, হতে পারে মর্মস্পর্শী। তা কেবল ৭ মার্চের ভাষণই বলে দেয়। যার নান্দনিক সৌন্দর্য এবং শব্দের প্রাচুর্য এখনো জনগণকে অনুরণিত করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া ৭ মার্চের ঐতিহাসিক এ ভাষণ শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলিলই নয়, জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় বিধানের একটি সম্ভাবনাও তৈরি করে। মূলত বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের আহ্বানেই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে বাঙালি। আপামর জনসাধারণ কীভাবে চেয়েছেন একটি দেশ হোক, একটি মানচিত্র হোক এবং আমাদের স্বাধীনতা হোক। এই কাঙ্খিত স্বাধীনতার জন্য যিনি দেবদূত হয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিরামহীন সংগ্রামে যিনি ছিলেন অকুতোভয়।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা। এরপরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রনিনাদে আসন্ন মহামুক্তির আনন্দে বাঙালি জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কাঙ্খিত মুক্তির লক্ষ্যে। পরবর্তীতে ওই ভাষণের প্রেক্ষিতে রচিত হয়েছে নানা কবিতা এবং প্রবন্ধ।

একনজরে ৭ মার্চ
৭ মার্চ, ১৯৭১-এর সকালে বঙ্গবন্ধু শরীরে জ্বর অনুভব করেন। কিন্তু এই কিংবদন্তি, ইস্পাতদেহীকে জ্বর কেন কোনো কিছুতেই কাবু করতে পারে না। বক্তব্যের পূর্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি টানা ৩৬ ঘন্টার এক বৈঠকে মিলিত হলেও কোনো স্থির সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বঙ্গবন্ধু কি বলবেন, সেই দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। তবে এই সময়ে তাকে ভরসা দেন তার ছায়াসঙ্গী, যিনি ১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলায় প্যারোলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিরোধিতা করে অন্যরূপ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যে কারণে আইয়ুব সরকার মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু ও মামলায় অন্যান্য বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। তিনি হলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, সবার ভাগ্য আজ তোমার উপর নির্ভর করছেৃ অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে, তুমি নিজে ভেবে যা বলতে চাও নিজের থেকে করবে। তুমি যা বলবে সেটিই ঠিক হবে।’ বঙ্গবন্ধু ঠিক তাই করেছিলেন।

দেশের শিক্ষাবিদরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঙালি জাতির শপথ। কারণ, ওই দিন ভাষণটি শোনার পর গোটা জাতি শপথ নেয় এবং দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়।

রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুধু বাঙালি জাতিকে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান নয়। এটি সব জাতির মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পরার দিক-নির্দেশনা।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং ৭ মার্চের সভায় উপস্থিত তোফায়েল আহমেদ তার একটি লেখায় বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর চশমাটা সেদিন ডায়াসের উপর রেখে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার পুরোটাই অলিখিত। একদিকে তিনি পাকিস্তানিদের প্রতি চার দফা শর্ত আরোপ করলেন, অন্যদিকে ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলতে বললেন। ভাতে মারার কথা বললেন, পানিতে মারার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘সাতই মার্চের আগে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। একজন তাঁকে বললেন জনগণ কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া মানবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বললেন, তুমি তোমার কাজ কর। আমি তাঁদের নেতা, আমি তাঁদের পরিচালিত করবো, তারা আমাকে নয়।’

৭ মার্চের প্রেক্ষাপট- ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন এবং ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের সাক্ষী এ দেশের জনগণ। এরপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্ষমতার মসনদে আসীন হওয়ার লিপ্সার প্রতিবাদে বাংলার মানুষকে করে তুলেছিল অদম্য সাহসী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠিত হয় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ। পশ্চিম পাকিস্তানিরা টানা নয় মাস হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন করে দখলে নিতে চায় আমাদের ভূখ-। কিন্তু তা আর হয় না। কী করে হবে? এই দেশে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক নেতা, যার আহ্বানে লাখো লাখো মানুষ জমায়েত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। তার পূর্বেই তিনি নিজ যোগ্যতায় ভূষিত হয়েছিলেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনী লেখক কাজী কামাল আহমেদ তার গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব আত্মবিশ্বাসহীন এবং বঞ্চিত জনগণের পূর্ব বাংলাকে এক নতুন আশা এবং লক্ষ্যের দেশে পরিণত করেছেন। তিনি নীরব দুর্দশামাখা কণ্ঠগুলোকে, উদ্বিগ্ন কণ্ঠগুলোকে ভাষা দিয়েছেন; যে কণ্ঠ ছিল অশ্রুতপূর্ব।’ তাই এখনো কানে ভাসে, সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।

এদিকে, ২০০৯ সালের ১২ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ) বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবনা ইউনেস্কোতে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ৭ মার্চের ভাষণটি ইউনেস্কোর অপর একটি অনুষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রার’ এ অন্তর্ভুক্তির জন্য অধিকতর উপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। অতঃপর ২০২০ সালের ১৭ জানুয়ারি কোরিয়ান ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন বিএনসিইউ-কে পত্র মারফত ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত মেমোরি অফ ওয়ার্ল্ড সম্পর্কিত কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এর আগে ১১-১৪ মার্চ, ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিএনসিইউ ৭ মার্চের ভাষণের ওপর প্রস্তুতকৃত খসড়া প্রস্তাব প্রেরণ করে। ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী কর্মশালা। ২০১৬ সালের ৪-১৫ এপ্রিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ১৯৯তম নিবার্হী বোর্ড সভা চলাকালে তৎকালীন শিক্ষা সচিব এবং শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে পরিমার্জিত প্রস্তাবনাটি ইউনেস্কোতে জমাদানের লক্ষ্যে প্যারিসস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেরণ করে। অতঃপর নানা প্রক্রিয়া শেষে ভাষণটি ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অফ ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রার’ -এ বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে গৃহীত হয়। ভাষণটি বর্তমানে তফসিল আকারে বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত (পঞ্চদশ সংশোধনী) হয়েছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে দিনটিকে স্মরণীয় ভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়াও এদিন বিকেল ৪টায় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ ভবনে (তেজগাঁও) আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোনালী বার্তা/এসআর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর