বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন

রাজশাহীতে চার যুগে ভরাট তিন সহস্রাধিক জলাশয়

মোঃ রমজান আলী, রাজশাহী / ৪৩ Time View
Update : শনিবার, ২২ জুন, ২০২৪

ঢাকাকে যেমন বলা হয় মসজিদের শহর। সিলেটকে হাড়রে শহর। আর বরিশালকে বলা হয় খালের শহর। সেখানে ৮০’র দশকেও রাজশাহীতে বলা হতো পুকুরের শহর। তবে এটি এখন কেবলই ইতিহাস। কালের গর্ভে যেমন ‘পুকুর’র শহর শদ্বটি হারিয়ে গেছে, তেমনি এই শহরের পুকুর-পুষ্করিণী, দিঘী, নয়নজুলি, ডোবাও বিলিন হয়ে গেছে নানামুখী কার্যক্রমের ফলে।

গত চার যুগে ভরাট হয়েছে অন্তত তিন সহস্রাধিক পুকুর। খোদ প্রশাসন থেকে শুরু করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশনও বাদ যায়নি দিনে দিনে পুকুর ভরাটে অংশ নিতে। তবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছেন প্রভাবশালী মহল ও জমির মালিকরা। এদের থাবায় এখনো বিলিন হচ্ছে ঐতিহাসিক রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন প্রকার জলাশয়।

হ্যারিটেজ রাজশাহীর সভাপতি ও নদী এবং জলাশয় গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকীর লেখা একটি বইয়েও উঠে এসেছে, পুকুরের নগরীর রাজশাহীতে ষাটের দশকে ৪ হাজার ২৮৩টি পুকুর, দিঘী, নয়নজুলি ও অন্যান্য ডোবা ছিল। সেটি গত ২০১৫ সালের মধ্যে নেমে এসেছে মাত্র ২০০ এর ঘরে। গত ৯ বছরে ভরাট হযেছে আরও শতাধিক পুকুর।

ফলে এখন নগরীতে পুকুর দিঘীর সংখ্যা সাকূল্যে একশ’র ঘরে এসে ঠেকেছে। গত কয়েক বছরে ব্যাপক হারে পুকুর জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, ভবন, দোকানপাটসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান।

পুকুর ভরাট ঠেকাতে হ্যারিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহাবুব সিদ্দিকী ২০১০ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে উচ্চ আদালত রাজশাহী নগরীর সকল ধরনের জলাশয় ভরাটে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে বলছিলেন।

সেই অনুযায়ী ২০১২ সালে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নগরীতে জলাশয় ভরাটে কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে বলে লিখিত দিয়ে ছিল উচ্চ আদালতকে। কিন্তু তার পরেও থামানো যায়নি এই ভয়ঙ্কর কাজটি। যার ফলে রাজশাহী এখন দেশের মধ্যে চরম ভাবাপন্ন শহর হিসেবে পরিচিত। এই কয়দিন আগেই এখানে দেশের সর্বোচ্চ রেকর্ড তাপমাত্র ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল।

তাপমাত্রার দিক থেকে চরমভাবাপন্ন এই অবস্থার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় নির্দয়ভাবে একের পর এক পুকুর জলাশয় ভরাটকে। এই তো কদিন আগেও রাজশাহী নগরীর ঐতিহ্যবাহী দায়রাপাক নামে সাড়ে ৬বিঘা আয়তনের একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে কলাচাষ করছেন জমির মালিক। হালিম উদ্দিন নামের ওই ব্যক্তি সম্প্রতি পুকুরটি কিনে নেন। সেখানে প্লট আকারে জমি বিক্রি করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলায় মূল লক্ষ্য তাঁর। এভাবেই একের পর এক পুকুর জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে রাজশাহী নগরীতে।

২০১৫ সালে নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর গবেষণায় উঠে এসেছে, ষাটের দশকে রাজশাহী শহরে পুকুর জলাশয়ের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২৮৩টি। সেটি ৮১ সালের দিকে নেমে আসে ২ হাজার ২২৭টিতে। ২০০০ সালে সেটি নেমে আসে ৭২৯টিতে। ২০০৯ সালে গিয়ে ঠেকে ৩১৩টিতে। এর পর ২০১৫ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ২০০টির মতো।

জানতে চাইলে নদী ও জলাশয় গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘বর্তমানে রাজশাহীতে পুকুর ও জলাশয়ের সংখ্যা সাকূল্যে একশ হবে। এর বেশি হওয়ার কথা নয়। কারণ যেগুলো অবশিষ্ট ছিল গত কয়েক বছরে নির্দয়ভাবে এ নগরীর পুকুরগুলো ভরাট করা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। রাতারাতি বা দিনের পর ময়লা-আবর্জনা ফেলেও পুকুরগুলো কৌশলে ভরাট করা হচ্ছে। এক পর্যায়ে গিয়ে গোটা পুকুর বা জলাশয় ভরাট করে সেখানে স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি যুগ যুগ ধরেই ঘটে চলেছে রাজশাহীতে। কেউ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি আরও বলেন, উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে কোনোভাবেই পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা যাবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কেউ ব্যবস্থাও নেয় না। সেই সুযোগে যার যার ইচ্ছেমতো জলাশয় ভরাট করছে। এখন আর রাজশাহী শহরে কোনো দিঘী খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ এই শহর ছিল একসময় পুকুরের শহরের নামে পরিচিত। এখানে ঐতিহাসিক বিশাল বিশাল দিঘী ছিল। সবগুলো ভরাট করেছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তি মালিকরাও।

ভরাট হয়েছে ২৫৮ ঐতিহাসিক দিঘী জলাশয়: গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর লেখা ‘বাংলাদেশের বিলুপ্ত দীঘি-পুস্করিণী-জলাশয়’ বইয়ে উঠে এসেছে, মূলত সত্তোর দশক থেকে রাজশাহী শহরে জলাশয় ভরাট শুরু হয়। আশির দশক থেকে এটি আরও নির্দয়ভাবে ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। ফলে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে যেসব পুকুর-পুস্করিণী ভরাট করা হয় এর মধ্যে ‘ঐতিহাসিক’ বা ঐতিহ্যবাহী ২৫৮টি পুকুর-পুস্করিণীও রয়েছে।

মহাকাল দীঘি। এককালে রাজশাহীর নামকরণ ছিল মহাকালগড়। এই অঞ্চলের সমস্ত রাজারা দৈত্যদানবের উপাসনা করতেন। এঁদের আচার-আচরণেও ছিল তেমনভাব। দৈত্যদানবদের তুষ্ট করতে এই শহরেই দেওয়া হতো নরবলি। আজও রাজশাহী শাহমখদুম মাজারের একটি কোণে নরবলিতে ব্যবহৃত যন্ত্রটি রাখা আছে। হযরত শাহ মখদুম সেই নরবলি দেওয়া রাজাদের বিরেুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করে নরবলি প্রথা বিলুপ্ত করেছিলেন। এরপর নগরীর পাঠানপাড়া এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন আশ্রম। তাঁর আশ্রমের মাজারের পাশেই ছিল মহাকাল দীঘি। ১৯২৯-৩০ সালের দিকে বিশালাকার এই দীঘিটি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় রাজশাহী কলেজের মাঠ। বর্তমানো শাহ মখদুম মাজারের নিচের পুকুরটির একটি অংশ ছিল সেই দীঘির পশ্চিমাংশ।

হাতিডোবা দীঘি। রাজশাহী নগরীর শিরোইল বাসস্ট্যান্ড ও রেল স্টেশনের এক নম্বর প্লাট ফর্মের একটি অংশে ছিল বিশালাকার হাতিডোবা দীঘি। জমিদার বাবু ভবানিচরণ ছিলেন এই দীঘির মালিক। জনশ্রুতি ছিল, ওই জমিদারের একটি হাতিও ডুবে মারা গিয়েছিল সেই দীঘিতে। সেই থেকে দীঘিটির নামকরণ হয়েছিল হাতিডোবা দীঘি। ১৯৫৮ সালে নগরীর শিরোইল এলাকার বাসিন্দা মোসলেম হুদা দীঘিটি কিনে নিয়েছিলেন। এর পর ১৯৮২ সালে ওই দীঘিটি ভরাট করে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শিরোইল বাসস্ট্যান্ড গড়ে তোলেন।
বড়কুঠি দীঘি। রাজশাহী-নাটোর সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য ১৯৮৫-৮৬ সালে ভরাট করা হয় নগরীর বড়কুঠি এলাকার বিশালাকার বড়কুঠি পুকুরটি। পুকুরটি প্রথমে ছিল বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর।

এরপর সেটি চলে যায় রাবর্ট ওয়াটসন কম্পানীর হাতে। পরবর্তি মেদেনীপুরের জমিদারী সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল পুকুরটি। সেটি এখন কেবলই কাগজে-কলমে। এছাড়াও ভরাটের তালিকায় আছে, শ্রুতকীর্তিদের পুকুর, পর্বত শেখের পুকুর, বন পুকুর, খোলা পুকুর, কালী পুকুর, সোবহান মিয়ার পুকুর, ধোপা পুকুর, তুরকান শাহর পুকুর, উকিলদের পুকুরসহ ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ২৫৮টি পুকুর জলাশয়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বলেন, ‘পুকুর বা জলাশয় ভরাটরোধে আইন থাকলেও মানা হচ্ছে না। গোপনে একের পর এক জলাশয় ভরাট হচ্ছে।

তবে সেসব স্থানে আমরা কোনো স্থাপনা গড়ে তোলার অনুমতি দেয় না।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, পুকুর-জলাশয় ভরাটের কারণে রাজশাহীর পরিবেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমরা ১৬টি পুকুর সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধিন পুকুরগুলো এখনো ভরাট হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। তাদের নির্লিপ্ততায় পুকুর-জলাশয় ভরাট হচ্ছে ব্যাপক হারে।

সোনালী বার্তা/এমএইচ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর