বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

বাংলা ব্লকেডে অচল দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০২৪

কোটা পদ্ধতি সংস্কারের এক দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের উত্তাল ‘বাংলা ব্লকেড’ আন্দোলন চলছে। গতকাল সকালে আপিল বিভাগে শুনানির পর আন্দোলনে এক প্রকার অচল হয়ে পড়েছিল দেশ। পুরো রাজধানী ছিল অবরুদ্ধ। দেশের প্রায় সব মহাসড়কেই অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সড়কে যান চলাচল বন্ধের পাশাপাশি অবরুদ্ধ ছিল রেলপথগুলো। ফলে দেশের বড় অংশে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় তীব্র যানজট ও চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

এ ছাড়া সর্বাত্মক ব্লকেডে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে আটকা পড়েন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিদায়ী রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি। পরে সড়কে কিছু সময় হেঁটে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান তিনি।

আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে একই দাবিতে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করবেন আন্দোলনকারীরা। বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব মোড়, কাকরাইল, পল্টন, পরীবাগ, চানখাঁর পুল মোড়, গুলিস্তান, মহাখালী, আগারগাঁও মোড় অবরোধের মাধ্যমে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।

এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, বরিশালসহ সারা দেশে বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে রেলপথ অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র শিডিউল বিপর্যয়ের।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫% কোটা বহাল করে অন্য সব কোটা বাতিলের দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারে সর্বাত্মক ব্লকেড কর্মসূচি পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে শহরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘সারা বাংলা ব্লকেড, ব্লকেড-ব্লকেড’, ‘হাই কোর্ট না শাহবাগ, শাহবাগ-শাহবাগ’, ‘কোটা নাকি মেধা আগে, জবাব চাই শাহবাগে’, ’১৮ এর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ’১৮ এর পরিপত্র, বহাল করতে হবে’, সংবিধানের মূলকথা, সুযোগের সমতা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’সহ নানা স্লোগান দেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা জানি এ রায় আদালতের মধ্যে অবশিষ্ট নেই। আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে আদালতের সম্পর্ক নেই। সবকিছুই সরকার এবং নির্বাহী বিভাগের হাতে। তাই তাদেরই ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা বলেছি, কোটা কেবল তিনটি ক্ষেত্রে দেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী বাদে সব কোটা বাতিল করতে হবে। আর কোটা হবে ৫%।

আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ হোসাইন পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করা হবে। সারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবস্থান নেবেন এবং অন্যান্য দিনের ব্লকেড কর্মসূচির মতোই পালন করা হবে। তিনি আরও বলেন, দুটি কাজ করলে আমরা ঘরে ফিরে যাব। প্রথমত, অযৌক্তিক কোটা বাদ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোটা সংস্কারের জন্য পরিষদ গঠন করতে হবে। যতদিন এই দুটি কাজ আমলে নেওয়া হবে না ততদিন এক দফা দাবিতে আমাদের ব্লকেড কর্মসূচি পালিত হবে।

শেকৃবি প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর আগারগাঁও মোড় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত সড়ক অবরোধ করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। ফলে দিনভর মিরপুর-ফার্মগেট এবং মহাখালী-শিশুমেলা সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। জাবি প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই কর্মসূচির অংশে চট্টগ্রামে রেল ও সড়কপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। চবি প্রতিনিধি জানান, আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ প্রত্যাখ্যান করে চট্টগ্রামে রেল ও সড়কপথ অবরোধ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিভুক্ত কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। দিনব্যাপী আন্দোলনে চট্টগ্রাম শহরজুড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকা অবরোধ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এর আগে সকাল পৌনে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে চড়ে ১৭ কিলোমিটার দূরে দেওয়ানহাটে আসেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে দেওয়ানহাট রেলপথ অবরোধ করেন তারা। এর ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা|

রাবি প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে রাবির প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে অবস্থান নেন তারা। পরে সেখান থেকে রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আন্দোলন করেন। এ সময় রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সব যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ : কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকে দড়ি টেনে ও গাছের খুঁটি ফেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজসহ কুমিল্লার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। অবরোধের ফলে মহাসড়কের দুদিকে কয়েক কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়।

কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ : ইবি প্রতিনিধি জানান, গাছের গুঁড়ি ও বেঞ্চ দিয়ে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ফলে মহাসড়কের উভয় দিকে প্রায় দীর্ঘ ১০-১৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

খুলনায় রেল-সড়ক অবরোধ : খুলনা প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল থেকে খুলনা-যশোর মহাসড়কের নতুন রাস্তা মোড়ে অবরোধ করেন সরকারি ব্রজলাল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত কলেজ শিক্ষার্থীরা। এতে খুলনা-ফুলতলা, খুলনা-যশোর মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া বেনাপোল থেকে আসা একটি ট্রেন আটক করেন শিক্ষার্থীরা। এতে রেল যোগাযোগ ব্যাহত হয়।

বাকৃবি শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধ : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির অংশ হিসেবে রেলপথ অবরোধ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনটি অবরোধ করেন তারা। ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ : রংপুর প্রতিনিধি জানান, সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা। এ সময় সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যুতে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা প্রত্যাখ্যান করেন তারা। সুষ্ঠু সমাধান না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন শিক্ষার্থীরা।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, দুপুরে টাঙ্গাইল-নাগরপুর-আরিচা আঞ্চলিক সড়কের কাগমারী মোড় অবরোধ করেন মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, সকালে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সিলেট প্রতিনিধি জানান, বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কের উভয় পাশে অন্তত ৫ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। বিকাল ৫টায় তারা অবরোধ তুলে নেন।

মেট্রোরেলে উপচে পড়া ভিড় : এদিকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিতে ঢাকায় যান চলাচলে অচল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ঘরে ফেরা মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল মেট্রোরেল। শিক্ষার্থীদের চলমান সর্বাত্মক ব্লকেডে মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সরেজমিন মেট্রোরেলের শাহবাগ, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর-১০ স্টেশনে ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। এক-দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট মিলছে না। অনেক স্টেশনে টিকিটের লাইন তিন তলা থেকে দুই তলা পর্যন্ত চলে এসেছে।

 

সোনালী বার্তা/এমএইচ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর